ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না সভায়, নির্ধারিত হয় রান্নাঘরে, উঠানে, বাতিঘরের আলোয়। এই সম্পাদকীয়তে আমরা বলছি — মাতৃভাষার দায়িত্ব এখন প্রতিটি পরিবারের হাতে।
সম্পাদকীয়: ভাষাকে বাঁচাতে হবে ঘরে ঘরে
একটি ভাষার জীবন ও মৃত্যু ঘটে না কোনো একটি বড় ঘটনায়। সেটা ঘটে ধীরে — রোজ রাতের খাওয়ার টেবিলে কোন ভাষায় কথা হল, সেখানেই। স্কুলের বই যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, শিশুর প্রথম অভিধান তার মায়ের মুখ। সেই মুখ যদি নিজের ভাষায় কথা বলা ছেড়ে দেয়, বাক্যের বাঁধন হারায়।
আমাদের সমাজ আজ এক অসাধারণ সময়ের মুখোমুখি। ছেলেমেয়েরা পড়ছে দেশ-বিদেশে, কেউ বাড়ির বাইরে বড় হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষার সম্পর্কটা হয়ে উঠছে ইচ্ছে-করা সম্পর্ক। অনলাইনে যখন সারা পৃথিবী হাতের মুঠোয়, তখন নিজের ভাষাকে আঁকড়ে থাকা কোনো বাধা-বিপত্তির কথা নয় — বরং সেটা একটা সচেতন পছন্দ। আর সচেতন পছন্দ তৈরি হয় বাড়িতে।
তাই আমাদের প্রস্তাব সহজ। বাড়িতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় দিনের অন্তত একটা বেলা কথা হোক — গল্পে, গানে, রান্নার প্রণালীর কথায়। দাদি-নানিরা যা বলতেন, সেই প্রবাদগুলো একবার লিখে রাখা হোক। বাচ্চাদের সামনে ভাষাকে নিয়ে লজ্জার কথা বলা বন্ধ হোক — বরং বলা হোক, তোমার হাতে দুটো ভাষা, দুটোই তোমার অস্ত্র।
প্রশাসনিক স্বীকৃতি বা বই-পুথির সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলো ভাষার ফসল, বীজ নয়। বীজটা পড়ে আছে ঘরের ভিতরে — মায়ের ঠোঁটের সুরে, বাবার ডাকে, পাড়ার গানে। সেই বীজ যদি রোজ রোজ জল না পায়, কোনো আন্দোলন তাকে বাঁচাতে পারবে না। উল্টো সেটা যদি পায়, কোনো বাধাই তাকে দাবাতে পারবে না।
কাকাই প্রতিদিন যত পরিবারে পৌঁছয়, আমাদের অনুরোধ তাদের কাছে — আজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে একটা গল্প বলুন নিজের ভাষায়। বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর গানটা হোক সেই গান, যা আপনার দাদি গাইতেন। ভাষা বাঁচবে ঘরে ঘরে — আর ঘর বাঁচলে সমাজ বাঁচবেই।