ফেসবুকে সবাই একসঙ্গে, কিন্তু খাবার টেবিলে সবাই একা। এই কলামে আধুনিক জীবনের সুবিধা আর পারিবারিক সংস্কৃতির সম্পর্ক — দুটোকে কীভাবে একসঙ্গে চালানো যায়, তার সহজ উপায়।
মতামত: আধুনিক জীবনে পারিবারিক সংস্কৃতির টানাপোড়েন
সন্ধ্যার খাওয়ার দৃশ্যটা মনে করি। এক সময় উঠানে মাদুর পাতা হত, সবাই মুড়ি-ভাত হাতে বসত, বড়রা খাওয়াত, ছোটরা শুনত। আজ তাকে সেই দৃশ্য নেই — আছে সোফায় বসে ডিনার, হাতে প্রত্যেকের ফোন, টেবিলে টেলিভিশন। খাওয়া হয়, কিন্তু মিলন হয় না।
এই লেখা কোনো পুরনো দিনের পোড়া-পোড়া রোমান্স নয়। আধুনিক জীবনের সুবিধাগুলো আমাদের ফিরিয়ে আনেছে অনেক কিছু — শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রবাসীদের সঙ্গে দৈনিক যোগাযোগ। সমস্যা হল, সুবিধা যত বাড়ে, সময় তত ভাগ হয়। আর সংস্কৃতি বলতে গেলে কিছুই না — সংস্কৃতি আসলে অভ্যাসের নাম। সন্ধ্যার সেই বসা, ছুটির দিনের সেই গান, প্রতিবার দাদির সেই পিঠা — এগুলোই সংস্কৃতির থাকা-না-থাকার হিসাব।
আমার দেখা সবচেয়ে সফল পরিবারগুলো কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলে। বাড়িতে সপ্তাহে অন্তত একদিন একসঙ্গে রান্না হয় — ছোটরা মশলা বাটে, বড়রা পুরোনো গান গায়। খাওয়ার টেবিলে ফোন রাখার নিয়ম — আজকের বাচ্চাদের ভাষায়, চার্জিং জোন বাড়ির বাইরে। আর ঘুম পাড়ানোর গান আজও হয় নিজের ভাষায় — এই একটা অভ্যাস বদলায় না, তাও অনেক।
ভয়ের কথা কী জানেন? সংস্কৃতি হারায় হঠাৎ করে না — হারায় অল্প অল্প করে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। এক প্রজন্ম গান ভুলে যায়, পরের প্রজন্ম গানের কথাটুকু জানেই না। তাই আমাদের লড়াই কোনো বিরাট যুদ্ধ নয় — প্রতিদিনের অগণিত ছোট সিদ্ধান্তের লড়াই। আজ রাতের গানটা হবে কি না — এইটুকুই।
শেষ করি একটা প্রস্তাবে। আগামী বছর বাড়ি বাড়ি একটা করে “পারিবারিক খাতা” চালু হোক — যেখানে লেখা হবে গানের কথা, প্রবাদ, পিঠার প্রণালী, আর উৎসবের তালিকা। সেই খাতা দাদার হাতে নাতনির হাতে পার হবে। যে সমাজ নিজের খাতা নিজে লেখে, ইতিহাস তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে — এই বিশ্বাসে বাঁধা রইলুম।