যে জাতি নিজের ইতিহাস অন্যের হাতে ছেড়ে দেয়, তার গল্প হয় অনুবাদ। এই কলামে সাংবাদিকতার সেই দায়িত্বের কথা — নিজের কথা নিজের ভাষায় লেখা।
মতামত: নিজের গল্প নিজেরাই লিখতে হবে
ছোটবেলায় আমার দাদি বলতেন — গল্প বলার লোক যদি বাড়িতে না থাকে, তবে বাড়ির গল্প বলে বেড়ায় পরের লোক। বড় হয়ে বুঝেছি, এই কথাটা শুধু বাড়ির জন্য নয়, গোটা জাতির জন্যও খাটে। আমাদের ইতিহাস আজ পর্যন্ত যেভাবে লেখা হয়েছে, তার অধিকাংশই লেখা অন্যের হাতে, অন্যের ভাষায়, অন্যের দৃষ্টিতে।
ফলটা কী হয়? আমাদের সুর হয়ে যায় পাদপ্রমাণ। আমাদের উৎসবের বর্ণনা হয় অন্যের পাতায় প্রান্তিক পরিশিষ্ট। ভাষার যে সূক্ষ্ম রসটুকু — ঠাঁই-মাত্র, সেই শব্দটির মানে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমাদেরই খাতা খুলতে হয়। যে জাতি নিজের অভিধান নিজে লেখে না, তাকে নিজের নামও উচ্চারণ করতে দিতে হয় অন্যকে।
এখানেই সাংবাদিকতার কাজটা শুরু হয়, আর এখানেই আমাদের ভাষার সংবাদপত্রের দায়িত্ব। কারিগরি সংবাদ নয় — চাই নিজের চোখে দেখা সংবাদ। কারও উদ্ধৃতি নয় — চাই নিজের সাক্ষাৎকার। আর সবচেয়ে বড় কথা, চাই নিজের ভাষায় শিরোনাম, যে শিরোনাম পড়ে পাড়ার মানুষ বলবে — এ তো আমাদের কথাই লিখেছে।
আমি দেখেছি, তরুণরা লিখতে চায়, কিন্তু ভয় পায় — ভাষা নিয়ে লজ্জা নয়, বানান নিয়ে ভয়। তাদের বলি, বানান শুধাতে হয় মাষ্টারকে, ভাষা শুধাতে হয় মাকে। ব্যাকরণ আসে পরে, মনের জোর আসে আগে। প্রথম লেখা যদি ভুল হয়, তবু তা হবে আমাদের নিজের হাতের ভুল — অন্যের হাতের সঠিক লেখা নয়।
তাই আবার সেই পুরোনো অনুরোধ। লেখো। ছোট খবর লেখো, গায়ের গান লেখো, দাদির বলা প্রবাদ লেখো। কাগজে লেখো, ফোনে লেখো, দেয়ালে লেখো। কারণ একদিন যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে — তোমরা কে ছিলে? — উত্তরটা তখন খুঁজতে হবে কারো লেখা পাতায় নয়, নিজেদের লেখা পাতায়।